সীমান্তে হত্যা

তিন দিক ঘিরে আছে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর মাঝখানে বাংলাদেশ। এই মাঝখানে টিকে থাকাটাই যেন বাংলাদেশের জন্য কাল হয়েছে। বাংলাদেশের সাথে  ভারতের আন্তর্জাতিক সীমারেখা ৪,০৯৬ কিলোমিটার।  স্বাধীনতার পর থেকেই এই সীমান্তে ভারতের বৈরী আচরণের শিকার বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ। মূলত ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, বিএসএফ কর্তৃক সাধারণ ও বেসামরিক বাংলাদেশি নাগরিকদের উপর সংগঠিত হচ্ছে নিয়মিত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড।  সীমান্তে চোরাচালান ও বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বিতর্কিত শ্যূট-অন-সাইট (দেখামাত্র গুলি) নীতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বহাল আছে, যার প্রেক্ষিতে বিএসএফ কারণে কিংবা অকারণে বাংলাদেশি নাগরিককে গুলি করতে পারে।  আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, হাট-বাজার, বিকিকিনি করা এবং কাজ খোঁজার জন্য অনেক মানুষ নিয়মিতভাবে সীমান্ত পারাপার করে। এছাড়াও সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে কৃষিজমিতে কৃষিকাজ কিংবা নদীতটে মৎস্য আহরণের জন্যও অনেক মানুষকে সীমান্ত পথ অতিক্রম করতে হয়। কিন্তু এসব কাজকে কোন অপরাধ বিবেচনা না করা হলেও , বিভিন্ন সময়ই বিএসএফ এর আক্রমণের শিকার হোন নিরপরাধ বাংলাদেশীরা।

বলা হয়ে থাকে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সাথে মহাজোট সরকারের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। আর ভারতও নাকি তাদের জন্য সুবিধাজনক হিসেবে আওয়ামীলীগকে বিবেচনা করে থাকে। তাই এই মহাজোট সরকার আসার পর সীমান্তবর্তী মানুষগুলোর আশা ছিলো এই সীমান্ত হত্যার একটা সুরাহা হবে। কিন্তু দেখতে দেখতে ১০টি বছর পার হয়ে গেলো। আসক, অধিকার ও বিজিবি প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, এই দশ বছরেই বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৩১ জন। আর আহত ও অপহরণের শিকার যথাক্রমে ৬২০ ও ৫৬২। এসব ছাড়াও আরো ২৭৫ জনকে অপহরণের পর সীমান্তে বিভিন্ন দফায় বৈঠকের পর ছেড়ে দেয়া হয়।

 

বছর মৃত্যু আহত অপহরণ অপহরণের পর ফেরত
২০১৮ ১১ ১১
২০১৭ ২৫ ৩৯ ৪০ ১৩
২০১৬ ৩১ ৩৯ ২৪ ২০
২০১৫ ৪৬ ৭৩ ৫৯ ৩১
২০১৪ ৪০ ৬৩ ১১০ ৬৭
২০১৩ ২৯ ৮৪ ১৭৫ ৪৯
২০১২ ৩৮ ১০০ ৭৪
২০১১ ৩৯ ৬২ ২৩
২০১০ ৭৪ ৭২ ৪৩
২০০৯ ৯৮ ৭৭ ২৫ ৯০
মোট ৪৩১ ৬২০ ৫৮২ ২৭৫

 

শুধু তাই নয়। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১২ তারিখে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাতকারে বিএসএফের মহানির্দেশক ইউ কে বনশল বলেন, “গুলি চালনা পুরোপুরি বন্ধ করা কখনোই সম্ভব না।”

২০১১ সালের জুলাইয়ে হিউম্যান রাইটস্‌ ওয়াচ সীমান্ত হত্যা নিয়ে বলে, “ভারত সরকারের বাংলাদেশের সীমান্তে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স কর্তৃক নির্যাতন, ও অন্যান্য অনাচারের নতুন অভিযোগের একটি, দ্রুত পরিষ্কার, এবং স্বচ্ছ অপরাধের তদন্ত দায়িত্বগ্রহণ করা উচিত।”

এই লক্ষ্যে ২০১৬ সালের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৪২তম সীমান্ত সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ঘটে যাওয়া প্রতিটি হত্যাকাণ্ড তদন্তে বিজিবি ও বিএসএফের যৌথ তদন্ত দল কাজ করবে।অথচ ৪৪তম সীমান্ত সম্মেলন শেষে যৌথ তদন্তের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বিএসএফ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো ঘটনা তদন্তের দায়িত্বটি পুলিশের। তাই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এমন ঠুংকু যুক্তিতে পূর্বের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার মানেই হচ্ছে এ সরকার সীমান্ত রক্ষার ব্যাপারে ভারতের নীতির কাছে অসহায়।

এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়, ফেলানী হত্যার বিচারের পর। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালের ফেলানী হত্যায় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। অথচ ভারতীয় আইনানুযায়ীই শুধুমাত্র অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি এমনকি আদম/ গরু পাচারের জন্যও কাউকে গুলি করে হত্যা করা যায় না, ভারতীয় আইনেও গুলি করা কেবল মাত্র তখনই জাষ্টিফাইড যখন সীমান্তরক্ষীর নিজের প্রান বিপন্ন হয় । এছাড়া ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুমে’র তথ্য অনুযায়ী, ‘যেখানে ফেলানি মারা যায়, সেখান দিয়ে ওর আগে আরও চল্লিশজন বেড়া পেরিয়েছে – বিএসএফ – বিজিবি টাকা নিয়েছে সবার কাছ থেকে। এটা ওয়েল রেকর্ডেড।’ তারা আরো জানায়, ‘ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেকের জীবনের অধিকার রয়েছে। শুধু ভারতের নাগরিক নয়, দেশের মাটিতে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির। এক্ষেত্রে সেটাও লঙ্ঘিত হয়েছে।’ এতগুলো শক্ত তথ্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অবস্থান কি?? তখনও বাংলাদেশের সরকারের তরফ থেকে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ ছাড়া আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়াই দেওয়া হয় নি। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কী হবে কিংবা কোনও উদ্যোগ থাকবে কিনা সেটাও স্পষ্ট করেননি তৎকালীন বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী। আরও লজ্জার বিষয় এই যে, বাংলাদেশ চুপ করে থাকলেও, বিএসএফ এর রায়কে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেন ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুমে’র প্রধান কিরীটি রায়। এ তো গেল সরকারের নম নম নীতির কথা। এটুকু করেও যদি সরকার ক্ষান্ত থাকতো তাহলেও মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যেত। কিন্তু সরকারে প্রত্যক্ষ অসহযোগিতার প্রমান পাওয়া যায় এই মামলায়।

মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ এর ভাষ্যমতে, এই মামলার আগে তারাও একবার ভারতীয় আদালতে ফেলানি হত্যা নিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তখন ফেলানির পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি আর সহযোগিতা তাঁরা পান নি। কারণ কি? বাংলাদেশে আসার জন্য মাসুমের দু’জন মানবাধিকার কর্মী কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসে বারবার ভিসার আবেদন করার পরও ভিসা পাননি। এ দু’জন মানবাধিকার কর্মী হলেন মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চের চেয়ারম্যান, সিকিম আদালতের সাবেক বিচারপতি মলয় সেনগুপ্ত এবং সংগঠনটির শীর্ষ কর্মকর্তা কিরিটি রায়। কিরিটি রায় অভিযোগ করেছিলেন, এক সপ্তাহে ছয় দফায় তিনি উপ-দূতাবাসে ভিসার জন্য গিয়েছেন। প্রতিবারই তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। একটি দেশের নাগরিককে অন্যায়ভাবে হত্যা করবার পর তার প্রতিকার চাওয়ার ক্ষেত্রে এই হচ্ছে আমাদের অবস্থান, সাহস এবং যোগ্যতা।

অথচ বছর দুই আগে এনরিকা লেক্সি কেসে আমরা ভারতের যোগ্যতা আর দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই। এইখানে ফরিয়াদীর আসনে ছিলো ভারত, আর আসামী ছিলো ইতালি।

২০১২ সালে বঙ্গোপসাগরে চলমান ইটালিয়ান তেলবাহী জাহাজ এম টি এনরিকা লেক্সি’তে অবস্থানরত ইটালিয়ান মেরিন সেনারা গুলি চালিয়ে এমভি অ্যান্থনী নামের একটি ভারতীয় জেলে নৌকায় থাকা দু’জন ভারতীয় জেলেকে হত্যা করে। এই হত্যাকান্ড নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আইনী বিবাদ এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও টানাপোড়েন দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক জলসীমা না ভারতীয় জলসীমা, ভারত এই বিদেশী সৈনিকদের বিচার করবার এখতিয়ার রাখে কি না এতসব বিতর্কের মধ্যেই ভারতীয় আদালতে তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকান্ডের অভিযোগে বিচার শুরু হয়।

এই দুই সৈনিককে কেন্দ্র করে দুই দেশের দূতাবাস পর্যায়ে চরম বিরোধ দেখা দেয়। ভারত যেমন ইতালীর রাষ্ট্রদূতকে প্রবল চাপে রাখে, তেমনি ইতালিও ভারতীয় দূতাবাসের মেইলবক্স থেকে বুলেট উদ্ধারের ঘোষণা দেয়। যাই হোক, ভারতীয় চাপের মুখে দুই মেরিন সেনাকে রোম থেকে ফিরিয়ে এনে ভারতের কাছে হস্তান্তর করে ইতালি। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের ধোঁয়াশাপূর্ণ একটি জায়গাকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সরকার এবং আদালত ইতালির সৈন্যদের বিচার শুরু করে এবং তা অব্যাহত রাখে। এমনকি ইতালি সরকার দুই নিহত জেলের পরিবারকে দশ লক্ষ রুপি ক্ষতিপূরণ প্রদাণ করতেও বাধ্য হয়। এই বিচার এখনো ভারতের আদালতে চলমান। ভারতীয় সরকার, তাদের সুশীল সমাজ এবং আদালতের জন্য এটি এক চরম সফলতা।

এ থেকে আমাদের সরকারের অনেক কিছুই শেখার আছে। দেশের জনগণের স্বার্থে ভারতের যে অবস্থান এটি আমাদের জন্য একটা উদাহরণ। মুখে দেশ ও স্বাধীনতার কথা বলে ফেনা তুললেও সত্যিকার অর্থে মহাজোট সরকার জনগনের কথা আসলে কমই এ ভাবেন। এই মহাজোট সরকারের আমলে সীমান্তে যে পরিমান হত্যার শিকার হয়েছে বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক জনগণ তা আর কখনোই হয় নি। কখনো চাষাবাদ করতে গিয়ে কেউ ভারতীয় সীমান্তে ঢুকে গেছেন, কখনো গরু পারাপার করতে গিয়ে সীমান্ত পার হয়েছেন, আবার কখনো মাছ ধরতে গিয়ে সীমানা ক্রস করেছেন এমন ঘটনায় গুলির শিকার হয়েছেন বহু বাংলাদেশী। কিন্তু সরকার নির্বিকার। শুধু যে ভারতের হাতেই সীমান্তে আমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছি তা নয়, মায়ানমারের মতো দেশও আমাদের সেনাদের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। এটা আমাদের দেশের জন্য লজ্জার। দু একটা উদাহরণ দিলেই বুঝা যাবে।

২০১৪ সালের ২৮ মে বান্দরবানের পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিপির সদস্যরা বিনা উসকানিতে বিজিবির সদস্যদের উপর গুলি চালায়। ওই সময়ে বিজিবির সদস্য নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে একইভাবে অপহরণ করে নিয়ে যায়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। দুই দিন পরে অনেক টালবাহানা করে মিজানুরের লাশ ফেরত দিতে সম্মত হয় বিজিপি। বিজিবির প্রতিনিধিদল মিজানুরের লাশ নিতে গেলে উল্টো তাঁদের ওপর আবারও গুলি চালায় বিজিপি। মিজানুরের হত্যার এক বছর পেরুতেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয় ২২ শে জুন ২০১৫ সালে।

মায়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) নায়েক আবদুর রাজ্জাককে অপহরণ করে। ২২শে জুনে প্রকাশিত খবর অনুসারে জানা যায়, নায়েক রাজ্জাকের নেতৃত্বে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল ১৬ জুন সকালে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। দলটি বাংলাদেশ জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিল। এ সময় মায়ামারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির একটি টহল দল ট্রলারে করে বাংলাদেশ জলসীমায় প্রবেশ করে। এক পর্যায়ে দলটি বিজিবির নৌযানের কাছে গিয়ে থামে। বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়। এ সময় বিজিবির অন্য সদস্যরা বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে বিজিবির সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। এরপর বিজিপির ট্রলারটি রাজ্জাককে নিয়ে মায়ানমারের দিকে চলে যায়। এটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।

এতো কিছুর পরও সীমান্তে এমন বৈষম্য বন্ধের ব্যাপারে সরকারে যথাযথ কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় নি। সীমান্তে বিজিবির উপর এমন হামলা-হত্যা আমাদের দেশের নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। অথচ যখন এই বিজিবি-ই বিডিআর ছিলো তখন চিত্রটা এমন ছিলো না। ২০০১ সালের ঘটনাটিই যথেষ্ট বিডিআরের ক্ষমতা বোঝার জন্য।

২০০১ সালের ১৮ই এপ্রিল। বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক আর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে এদিন নিহত হয়েছিল অসংখ্য ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী। বাংলাদেশের ইতিহাসে ভারতের সঙ্গে সীমান্তে এরকম সংঘর্ষের নজির আর নেই। ১৮ এপ্রিল ভোরে বিএসএফ নগ্ন হামলা চালিয়েছিল বড়াইবাড়ি গ্রামে। হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিল বিডিআর আর বীর জনতা। ১৬ জনের লাশ ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল বিএসএফ। ৩ জন বীর বিডিআর সৈনিক শাহাদাত বরণ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে। বিএসএফরা যে বেআইনীভাবে বড়াইবাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ ভূ-খন্ডে প্রবেশ করেছিল তা নিয়ে কারো কোন সন্দেহ ছিল না। ৩০ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একসঙ্গে ১৬ জন বিএসএফের মৃত্যু ঘটে। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ১৬ সদস্য নিহত হওয়ার পরই পরাজয় স্বীকার করে তারা পিছু হটে। ১৮ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তরকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ.ল.ম. ফজলুর রহমান বলেন, ‘বিনা কারণে রৌমারী সীমান্তে বিএসএফয়ের গুলীবর্ষণ, ও প্রাণহানির জন্য ভারতকে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ গা বাঁচাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং ১৯ এপ্রিল মন্তব্য করেন যে, ‘পাদুয়ায় বিডিআরের অবাঞ্ছিত প্রবেশে শেখ হাসিনা সরকারের সায় ছিল না।’ ২০ এপ্রিল বিকেলে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় পররাষ্ট্র সচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেন, ‘সিলেটের তামাবিল এলাকার পাদুয়া থেকে বাংলাদেশ রাইফেলস বা বিডিআর-এর ঘেরাও তুলে নেয়া হয়েছে। ভারতও তার বিরোধপূর্ণ রাস্তাটি ভেঙ্গে দিয়েছে।’

বড়াইবাড়ীতে রাতের আধারে সীমান্ত অতিক্রম করে শত শত ভারতীয় সৈন্যের বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিডিআর সৈন্যদের হত্যা, বাংলাদেশের গ্রাম লুট ও জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনায় যখন সারাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার দাবি উঠেছে ঠিক তখনই তৎকালীন সরকার প্রধান ২২ এপ্রিল দিবাগত রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সাথে আধাঘণ্টাব্যাপী এক টেলিফোন সংলাপে বসেন এবং এই সময়ে ৩ বার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিডিআরের ভূমিকায় (বীরত্বের জন্য) দুঃখ প্রকাশ করেন। এদিকে নিজ দেশে বাজপেয়ী সরকারের মুখ রক্ষা করতে বাংলাদেশের সরকার প্রধান দুঃখ প্রকাশ করলে ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের দেশে শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে এ ঘটনায় দায়ভার এককভাবে বিডিআর প্রধানের উপর চাপিয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের ২য় বারের মত ক্ষমতায় পদার্পণের পর ভারতের মান রক্ষায় বিডিআর  এর নাম পরিবর্তনের জন্য উঠে পড়ে লাগে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তাকে নিজের জন্য হুমকি ভাবতে থাকে আওয়ামীলীগ। এর ফলাফল ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ। এ যেন এক ঢিলে দুই পাখি মারা। এ বিদ্রোহে তখনকার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ বিডিআরে কর্মরত অর্ধশতাধিক সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। যাদেরকে বিএনপি-জামাতপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হত। আর অন্যদিকে বিডিআর এর নাম পরিবর্তন করে বিজিবি করা হয়। জাতীয় সংসদে ২০১০ সালের ০৮ ডিসেম্বর ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন, ২০১০’ পাস হলে ২০ ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি বাহিনীর সদর দপ্তরে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) এর নতুন পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন। সেই সঙ্গে নতুন মনোগ্রাম উন্মোচনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ বাহিনীর নতুন পথচলা। এর অংশ হিসেবে বাহিনীর নাম, পোশাকসহ বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। এর মাধ্যমে বিডিআরের ৩৯ বছরের ইতিহাসের বিলুপ্তি ঘটে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ০৩ মার্চ এ বাহিনীর নামকরণ হয় বিডিআর (বাংলাদেশ রাইফেল্স)।

এতকিছুর পর এটা স্পষ্ট যে, সীমান্তে বিডিআর আর এখনকার বিজিবির মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। বিজিবি তাদের অতীতের ঐতিহ্য হারিয়েছে। যদি সীমন্তে এক শক্তিশালী বাহিনীর উদ্ভব করা না যায়, যদি এখনো মায়ানমার ও ভারতের পররাষ্ট্রনীতির মুখমোখি হওয়ার সাহস না দেখানো যায়, যদি বাহিনীর মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগকে জাগিয়ে তুলা না যায় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা আমাদের অস্তিত্ব নিয়ে হুমকির মুখে পড়ব এতে সন্দেহ নেই।

সীমান্তে হত্যা

সীমান্তে হত্যা

সীমান্তে হত্যা

চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিএসেফে'র হাতে বিজিবি'র সোর্স খুন
বিএসএফের গুলিতে নিহত ফেলানী
মিয়ানমারের হাতে নিহত বিজিবি সদস্য মিজানুর রহমান

সীমান্তে হত্যা

আট ঘন্টা ছট-ফট করে মারা যান কিশোরী ফেলানি

 

ফেলানী হত্যার পুনর্বিচারেও নির্দোষ বিএসএফ- CHANNEL 24

 

সীমান্তে হত্যা- নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিজিবি-বিএসএফের তথ্যে গরমিল CHANNEL 24

 

সীমান্তে হত্যা

সীমান্তে হত্যা

সীমান্তে হত্যা